top of page
Search

হোটেল ক্যালিফোর্নিয়ার আসল রুপ।

  • Writer: zahidur59
    zahidur59
  • Nov 2, 2020
  • 5 min read


ব্রেক টাইমে এমপ্লয়ী ক্যাফেটেরিয়াতে এক কোনায় বোসে নামাজ পড়ার চেষ্টা করছিলাম। নামাজ পড়ার জন্য মোটেও আদর্শ জায়গা না এটা কিন্ত উপায় কি? পারকিং লটের নির্জন জায়গায় চলে যাওয়া যায় কিন্তু সেটা তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ব্রেকের লিমিটেড টাইমে সম্ভব না। অন্য এমপ্লয়ীদের হাসি ঠাট্টা কিচির মিচির প্লাস মাথার উপরে কমন স্পিকারে হাই হুকু হাই হুকু গান, কিন্তু ওয়াক্তে থাকলে হলে এর মধ্যেই কঠিন মনোযোগ ও মনোবল সহযোগে কাজ সারতে হবে। সেরেও ফেলেছিলাম প্রায় কিন্তু হটাৎ মাথার উপরের স্পিকারে একুয়েস্টিক গিটারে ঈগলসের এবার গ্রীন হোটেল ক্যালিফর্নিয়া গানের ইন্ট্রো বেজে উঠলো। গান শোনা হয়না অনেক অনেক বছর কিন্তু পুরান পাপ কি সহজে মোছা যায়? দুর্বল চরিত্রের মানুষদের যা হয় আর কি, কোনো মতে বেড়া ছেঁড়া অবস্থায় নামাজ শেষ করলাম।


হোটেল ক্যালিফর্নিয়া গানটা শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এতটাই জনপ্রিয় একটা গান যে এটা আমার পছন্দের গান বলাটা একটা হাস্যকর ব্যাপার। আশ্চর্যের ব্যাপার আমার জন্মের আগে গাওয়া একটা গান এখনো এই বিংশ শতাব্দির হাই হুকু শিল্পীদের সাথে পাল্লা দিয়ে কমন স্পিকারে রেগুলার বেজেই চলেছে। পছন্দের গান হলেও অনেকেই কিন্তু খেয়াল করে না যে গানের কথা গুলি জানি কেমন কেমন। ঠিক বোঝা যায় আবার ঠিক যায়ও না। এটা অবশ্য সব উচ্চ মানের শিল্পকলারই খাইসলত। বলবে এক জিনিস কিন্তু বোঝাবে আরেক। আবার শিল্পীকে মানে জিজ্ঞেস করলে খোলাসা না করে বলবে এটা ওপেন এন্ডেড। যে যেভাবে বুঝবে সেটাই। শুধু শুধু পেরেশানি দেয়া আর কি। যদিও অনেকের জন্যে এটা কোনো ঘটনা না এবং সুখী মানুষদের হাতে অতো সময় দেয়ার মতো সময় না থাকলেও আমার সময়ের অভাব নাই। তাই ভাবলাম একটু ঘেঁটে দেখি গানটার অন্তর নিহীত কথার ব্যাপারে অন্যরা কে কি বলে। এবং আমার ধারণার সাথে কতটা মেলে। যদিও শিল্পকে এভাবে খোঁচানো ঠিকনা কিন্তু এটা আমার মাথা থেকে আপদ নামানোর মতো একটা ব্যাপার লাগছিলো। তাই সময় নষ্ট করে হলেও ঘাটা ঘাঁটি করলাম। এখন অন্যের সময় নষ্ট করাতে আসা যাক। বিজ্ঞদের মতামতের সাথে আমারটা মিশিয়ে গানটা একটু ব্যাখ্যা করি।


প্রথম খট্কা হলো গানটার নামেই। হোটেল ক্যালিফর্নিয়া। বোঝাই যাচ্ছে গানটা ক্যালিফোর্নিয়ার চরিত্র নিয়ে কথা বলবে কিন্তু হোটেল শব্দটা ব্যবহার করার দরকার কি ছিলো? ঈগলসের মতো বড় মাপের ব্যান্ডের তো কোনো হোটেলের বিজ্ঞাপন প্রচার করার দরকার নাই। তো জ্ঞানী গুণীরা দেখলাম বলছে, হোটেল জিনিসটাই হলো একটা ইন্টারেষ্টিং কেস। অনেকটা বাসার মতো কিন্তু বাসা না। বাসায় যা যা দরকার সবই আছে তবুও বাসা না। বাসা থেকে অনেক গুন্ সুন্দর এবং আরামদায়ক হবার চেষ্টার শেষ নাই কিন্তু কখনই বাসা না। বাসাই শুধুমাত্র বাসা এটাই সার্বজনীন। বাসার শান্তি কখনই হোটেলে পাওয়া যায় না। ক্ষনিকের জন্য মজা লাগলেও মাথার গভীরে কোথায় যেন সবসময় একটা সব ফেক সব সাজানো খচ্চ্খচানি থেকেই যায়। এখন হোটেল ক্যালিফর্নিয়া বলতে ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো হোটেল না পুরো ক্যালিফর্নিয়াটাই বাই নেচার একটা হোটেল বোঝানো হয়েছে সেটা একটা প্রশ্ন থেকে যায় । যাহোক বেশি জোরে লম্ফো না দিয়ে একটু আস্তে আস্তে আগানো যাক।


গানের শুরুটা অনেকটা টোপ গেলানোর মতো স্বাভাবিক ভাবে শুরু হয়েছে। আমার ভাষায় বললে, গহীন রাতে গায়ক তাঁর কনভার্টেবলের হুড নামিয়ে চুলে বাতাস লাগিয়ে মনের সুখে মরুভূমির রাস্তায় গাঁজার গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে যাচ্ছে। গায়ক অবশ্য সরাসরি গাঁজার কথা বলেনি কিন্তু কালিটাস হলো গাঁজার মেক্সিকান স্ল্যাং। যাহোক হটাৎ একটা আলোর ঝলক দেখা গেলো। লং ড্রাইভিংয়ের পেরেশানি বা নেশার ভারে গায়কের মাথা চোখ এমনিতেই ভার ভার হয়ে আসছিলো তাই সে ভাবলো একটু থামা যাক। যদিও জ্ঞানী গুণীরা উল্লেখ করেনি কিন্তু একটু বলে রাখি এখানে আমার কাছে বর্ণনা গুলি একটু সন্দেহজনক ভাবে বিবলিকাল বিবলিকাল লেগেছে। গভীর রাত, মরুভুমিতে পথ চলা, দূরে আলোর ছটা, কেমন যেন একটা মোজেস মোজেস ভাব আছে। বিশেষ করে পরের লাইন গুলোতে মিশন বেলের শব্দ শোনা, তাঁর সাথে দেখা হওয়া, মোমবাতি জ্বালিয়ে তাঁর পথ দেখানো সব মিলিয়ে একটু যেন কেমন কেমন। গায়ক নিজেও মনে মনে ভাবছিলো, কে জানে স্বর্গে যাচ্ছি না নরকে। যদিও সুস্থ মস্তিষ্কের যে কেও বলবে শুধু শুধু এত বেশি ভাবার কি দরকার? এটা শুধু একটা হোটেলে ব্রেক একটা নেবার কথাই বলছে। আর গায়ক হোটেলটা ভালো হবে না খারাপ হবে সেটাই ভাবছে। সেক্ষেত্ৰ আমি বলবো শুদু শুদু গানটাকে এত বোরিং বানানোর কি দরকার? অন্তত গায়ক যে পরের লাইন গুলোকে আত্মিক ভাবে দেখার ইঙ্গিত দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। যাহোক ইন্ট্রোটার শেষে গায়ক বলছে তার মনে হচ্ছিল করিডোরে শেষ মাথা থেকে কারা যেন তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কোরাসে সবাই আহা কি চমৎকার আহা কি চমৎকার করছে। এই বেপারটাও কেমন যেন একটু সন্দেহজনক। কিছুটা গা ছমছমেও বটে। যেন সবাই কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। কি সুন্দর, জায়গার অভাব নাই, কি সুন্দর চেহারা, যে কোনো সময় চলে আসো, একটু বেশি গদো গদো যেন গায়ককে মাথায় হাত বুলিয়ে কোনো একটা দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চলছে। সেকেন্ড কোরাসের শুরুতেও গায়ক নিজেও এই অস্বাভাবিকতার বেপারে বলেছে - সে এখনো মাঝ রাতে ঘুম ভাঙ্গা ঘোরের মধ্যে তাদের ওই ডাক শুনতে পায়। যাহোক সেটা একটু পরের কথা তার আগে ইমিডিয়েট পরের লাইন গুলোতে আসা যাক।


পরের ভার্সে গায়ক গানের নায়িকার সম্মন্ধে বলেছে। এখন গানের নায়িকা কি একজন টিপিক্যাল ক্যালিফর্নিয়াবাসী না স্বয়ং ক্যালিফর্নিয়া নিজেই সেটা বলা মুশকিল কিন্তু গায়ক বুঝে গেছে এই নায়িকা কিছু সমস্যায় ভুগছে। আমার মতে এই লাইনগুলো কিছুদিন পরের কথা। কারণ গায়ক যেভাবে কনফিডেন্স নিয়ে বলছে তাতে বোঝা যায় সে অলরেডি লম্বা সময় ধরে অবজার্ভ করেই বলছে। কিছুদিন পরের বা একই রাতের কাহিনী যেটাই হোক, বিজ্ঞদেড় ভাষায় নায়িকার মোন টিফানি টুইস্টেড মানে সে মেটিরিয়ালিজমের প্যাচে আটকা পড়েছে। পরের লাইনে সেটা আরো ক্লিয়ার করার জন্য আবারো বলেছে তার আছে মার্সিডিস রোগ। লিরিক্সে যদিও মার্সিডিস বেঞ্জ লেখা কিন্তু গাওয়ার সময় গায়ক গেয়েছে - সি গট ডা মার্সিডিস বেন...ন্ড। বিজ্ঞদের মতে ইচ্ছে করেই একটু বেন্ড করেছে শব্দ নিয়ে খেলা করার জন্য। কারণ এতে মানে দাঁড়ায়, বাংলায় বললে - ওকে মার্সিডিসের রোগে পেয়েছে। তারপর তাঁর অনেক সুন্দর সুন্দর বন্ধু আছে না বলে বেশ কসরত করে ঘুরিয়ে পেঁচিযে বলছে তাঁর আছে অনেক সুন্দর সুন্দর ছেলেদের দল যাদের সে বন্ধু ডাকে। সে ডাকে, কিন্তু আসলেই বন্ধু ভাবে কিনা সন্দেহ আছে সেটা মোটা দাগে বোঝানোর জন্যই এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা। বন্ধু হোক আর না হোক পরের লাইনে সবাই মিলে তাদের ঘড়োয়া ময়দানে নাচার কথা বলা হয়েছে। এখানে সুইট সামার সোয়েট বলে ক্যালিফোর্নিয়ার দারুন ওয়াদারের রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। বেশ সুন্দর একটা চিত্র আকার পরপরই আমার মতে এ গানের সবচে করুন বর্ণনাটা এসেছে। দলবেঁধে ক্যালিফোর্নিয়ার মনোমুগ্ধকর পরিবেশে নাচে গানে লিপ্পো হলেও তারা সত্যি কি মোমেন্টগুলি এনজয় করতে পারছে? কারণ তাদের একদলের মন ব্যাস্ত ফেলে আসা অতীতের স্মরণে, আরেক দলের মন ব্যাস্ত পিছু ধাওয়া অতীতকে দমনে।


পরের লাইন দুটো বেশ ইন্টারেষ্টিং - "আমি ক্যাপ্টেনকে কে ডাক দিয়ে বললাম আমাকে এক গ্লাস ওয়াইন দাও তো, প্লিজ।" কথা হলো, ওয়াইন সার্ভ করার জন্য কেও ক্যাপ্টেনকে ডাক দেয় না। বারটেন্ডার, ওয়েটার বা বাটলার কে এভাবে বলতে পারি কিন্তু ক্যাপ্টেনকে না। হতে পারে সম্পর্ক ভালো বা বারটেন্ডারকেই মজা করে ক্যাপ্টেন ডেকেছে। আবার হতে পারে এখানে উঁচু মানের কাওকে নিচু মানের কাজে লিপ্ত হবার কথা বলা হয়েছে। কারণ পরের লাইনে ক্যাপ্টেন বলছে উনিশশো ঊনসত্তর পর থেকে এর সাপ্লাই নাই। উনিশশো ঊনসত্তর হলো আরেক কাহিনী। অতীব সংখেপে বললে অনেকের মতে উনিশশো ঊনসত্তরে ইনোসেন্সের মৃত্যু ঘটেছে এবং কমার্শিয়ালিজম আর ধাপ্পাবাজির জয় জয়ওকার শুরু হয়েছে। যাহোক আমার বোঝায় এই দুই লাইনে বুঝিয়েছে গায়কের পছন্দের জিনিস চেয়েও পাওয়া গেলো না। উনিশশো ঊনসত্তরে পর থেকে এখানে উচ্চ মানের মানুষ নিম্ম মানের জিনিস সাপ্লাই দিতেই ব্যাস্ত। এর পরপরই গায়ক এক লাফে দূর ভবিষ্যতে চলে গেছে যেখানে সে সেই অদ্ভুত জায়গা থেকে অনেক দূরে থাকলেও সেই অদ্ভুত জায়গা এখনো তাকে মাঝ রাতে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।


গানের মূল পান্তোতে এসে গায়ক হোটেল ক্যালিফোর্নিয়ার একদম সুপ্ত গভীরের কথা বলছে। হানিমুন সুইটে (মিররস অন দা সিলিং, পিঙ্ক সাম্প্যাইং ও টি আইস) বসে গানের নায়িকা তাঁর আসল রূপ প্রকাশ করছে - "এখানে আমার সবাই আমাদের নিজেদের জালে নিজেরাই বন্দি।" এরপর গায়ক দেখলো তাদের বিলাস ভুবনে তারা সবাই কিভাবে তাদের খায়েস পুরের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের ওই দানব খায়েস কখনই পূরণ হবার নয় সেটা উপলব্ধি করার পর গায়ক ওই জায়গা থেকে ঝেড়ে পালাবার চেষ্টা চালালে তাকে একজন থামিয়ে শান্ত হতে বললো। তারপর সেই লোক এক কঠিন সত্য দিয়ে গানটা শেষ করলো - "আমরা এভাবেই তৈরী। তুমি চাইলেই এখান থেকে পালতে পারো তবে তুমি তোমার কাছ থেকে কখনোই পালাতে পারবে না। "


গানের বেশ এক্সসেপ্সনালি লম্বা আউটট্র গিটারের বাজনাটা নিয়ে একদম না বললেই নয়। তবে বাজনা হলো সবচে ওপেন এন্ডেড একটা বস্তু। বাজনা ব্যাখ্যা করতে যাওয়াটা একটা দুরহ ও অসমীচিৎ বেপার। আমি শুধু বলতে পারি আমার কাছে হোটেল ক্যালিফোর্নিয়ায় আউটট্র টা একটা পারফেক্ট এক্সপ্রেশন অফ এ টার্মইলড , স্ট্রাগলিং এবং সেলফ কন্ট্রাডিকটিং মাইন্ড। তাই আইরনিক ভাবে নামাজ চলা কালে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউসিক হিসাবে এক্কেবারে পারফেক্ট ছিলো।

 
 
 

Comments


Logo-pixelman.png
bottom of page