যে জগৎকে দিয়েছে বেঁচে একা
- zahidur59

- Feb 20, 2021
- 3 min read

সকাল থেকেই মামদো ভুতের মতো ঘাড়ে চেপে বসে আছে। লক্ষণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে না বলা পর্যন্ত ছাড়বে না। তাই বলতে দেয়াই ভালো। তবে বলার আগে একটা ভাঙ্গা নড়বড়ে মই দাঁড় করানো দরকার। কেবল ভাঙা মই বেয়েই যে উপরে উঠে আসবে তাকেই বলা হবে কানে কানে। নির্ভানা (অরিজিনালি ডেভিড বাওই) এর গাওয়া একটা গান, "ম্যান হু সোল্ড দা ওয়ার্ল্ড'" এর বঙ্গানুবাদকেই মই হিসেবে দাঁড় করাতে পারি কি না দেখা যাক।
যদিও আমি নেই তবু
সিঁড়ি ভেঙ্গে তার সাথে হলো দেখা।
একথা ওকথার পরে সে হেসে বলে
তোমার কি মনে পরে
বন্ধু ছিলাম আমি?
চমকে উঠে ভাবি তাই তো!
তুমি? তুমি এখনো আছো বেঁচে?
ভেবেছি কবেই গেছো মরে, খেয়ে ধোঁকা।
নানা তা নয়, মোরা মানিনি পরাজয়, যেচে।
তুমি দেখছো তাকে
যে জগৎকে দিয়েছে বেঁচে একা।
তারপর দুজনে অট্ট হেঁসে দুহাত মিলিয়ে শেষে
চলে যাই যে যার ভুবনে।
যুগ যুগ ধরে
জগতে সে হেঁটেছে একা একা।
খুঁজেছে অদেখা জ্যোতি
তাঁজা কোনো অনুভূতি
ক্লান্ত ধূসর চোঁখে মিলেছে শুধু
এক মৃত সভ্যতা।
মাঝে মাঝে মনে হয়
এইই বুঝি পরাজয়?
শুধু তাকে একা ফেলে
অনেক অনেক আগে
সবাই গিয়েছে চলে,
আছে শুধু দেয়ালের লেখা।
নানা তাতো নয়,
মোরা মানিনি পরাজয় যেচে।
তুমি দেখছো তাকে
যে জগৎকে দিয়েছে বেঁচে।
একা।
যাহোক এবার মোদ্দা কথায় আসা যাক। ছোটো ছোটো বাচাদের কল্পনা শক্তি নাকি দারুন হয়ে থাকে। আমার না, বিজ্ঞানের কথা। অনেক ছোটো বাচ্চাদেরই নাকি দেখা যায় তাদের কাল্পনিক কোনো বন্ধুর সাথে খোশ গল্প করতে। তারপর একটু বড়ো হলে তাদের বাস্তবিক বন্ধুরা এসে মনের জায়গা দখল করে নেয়। তবে সবার না। কারো কারো কাল্পনিক বন্ধু অত সহজে হাল ছাড়ে না। বেশ কিছুটা বড়ো হবার পরও এই কাল্পনিক বন্ধু তার সাথে মনের সুখে খোস গল্প চালিয়ে যায়। সে চাক বা না চাক। তখন আর একে দারুন কাল্পনিক শক্তি বলা চলে না। তখন কোনো এক সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার নামে আখ্যায়িত করতে হয়। তবে ডুয়েল পার্সোনালিটি বা জিনের আসর যাই বলা হোক না কেন, ঝাড় ফুঁক বা সাইকোথেরাপির মাধ্যমে এদের বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনা যায়। তবে সবাইকে না। এখানে বলে রাখা ভালো, তুমি যদি ভাবো উপরে বেশ ফুরফুরে আলো বাতাস পাওয়া যাবে তাহলে এখনো সময় আছে মই বেয়ে নিচে নেমে যাবার। সামনে কিন্তু মেঘ কালো হয়ে আসছে। যাহোক যা বলছিলাম, সেই চিকিৎসাহীন অভাগাদের শেষে জায়গা হয় বাসার কোনার তালা দেয়া ঘরটাতে। অথবা কারো আর ঘর বাড়ী বলে কিছু থাকে না। তবে সবার খ্রত্রেই না কিন্তু।
এই সংখ্যালঘুদের মধ্যেও সংখ্যালঘুদের থেকে বের হয়ে আসা একজনের নাম ডেভিড। না ডেভিড নাম গ্রহণের আগে পেছনে কোনো কারণ নাই, একটা নাম দিলে বলতে সুবিধা তাই দেয়া। এনিওয়ে, ডেভিড এত সহজে পরাজিত হয় নি, যেচে। পীর সাহেব বা সাইকোলজিস্টটের ব্যার্থতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সে নিজেই নিজের বেবস্থা করে নিয়েছে। তার কল্পনার বন্ধুকে কল্পনার কোনার ঘরে তালা বদ্ধ করে সে শিখেছে সবার সাথে মিসতে, হাসতে, নিজেকে আড়ালে রাখতে আর তার জন্য সবচে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, কাওকে বিশাস না করতে। যদিও এজন্য তাকে সদা সতর্ক থাকতে হয়, যেটা মোটেও কোনো আনন্দদায়ক বেপার নয়। নিজেকে প্রায়ই হায়নার মতো কুতছিৎ কোনো প্রাণী বলে মনে হয় কিন্তু কি আর করা। তবে এই সদা সতর্কতাই তাকে শিখিয়েছে সব কিছু একটু অন্য ভাবে দেখতে। এ সতর্ক চোখেই সে খুঁজেছে এমন কাওকে যাকে সব খুলে বলা যায়। এভাবে সবার মাঝে সংগোপনে খুঁজতে খুঁজতেই এক সময় সে অনুধাবন করে বনে আর কোনো সিংহের বাস নেই। তাঁরা সবাই অনেক অনেক আগেই চলে গেছে। এখন চারিদিকে শুধু ভেড়ার পাল। এদের হাত চোখ নাক কান মুখ সবই আছে। আরো আছে ক্ষুদা লালসা আর সব হারাবার ভয়।
ভয় একটা ভয়ানক জিনিস। খুব সহজেই একে ভাইরাসের মতো দেশ বিদেশে ছড়িয়ে দেয়া যায়। গণিতের মারপেঁচে সামান্য একটু ভয় দেখালেই সব ভেড়ার দল গোয়ালে ঢুকে চুপচাপ টু শব্দ না করে বসে থাকে মাসের পর মাস। দু একটা গলা মেলে গাইতে গেলেই বাকিরা গুতিয়ে থামিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে যদি একটু আশ্বাস দিয়ে বলা হয় তোমাদের দেখভাল করা হবে, শুধু গায়ে একটা সিল মারো যেন চিনতে পারা যায় কে কোন গোয়ালের ভেড়া, একে অপরকে গুতো মেরে তারা লাইনে দাঁড়িয়ে পাছায় সিল মেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কেও কেও নিজেকে ভ্যাগ্যমান ও মনে করে। সিলের ছেচা এদের কোনো বোধ শক্তি জাগায় না। এরা পরের মাসেও আসবে। পরের বছরেও আসবে। লাগলে গাঁটের পয়সা খরচ করে হেলোও ছেচা নিতে আসবে।
যাহোক, ডেভিড ভেবে দেখেছে এই মৃত সভ্যতার পেছনে বুদ্ধি খরচ না করে এর নিয়তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে বেঁচে দিয়ে হায়নার দলে যোগ দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সমস্যা শুদু একটাই। সে জীবন ভর শিখেছে কাওকে বিশাস না করতে হয়। চাইলেও সে আর তা পারে না। তাই সারাদিন হায়নার দলে হুক্কা হুয়া জয়ধনী তুললেও বাসার ফেরার পথে তার খুব একা একা লাগে। তাই সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠায় সময় প্রায়ই সে কোনার ঘরের দরজার তালাটা খুলে একটু উঁকি দিয়ে দেখে সে কেমন আছে। হোক না কাল্পনিক, তবুও সেই তার একমাত্র বন্ধু। যাকে সব খুলে বলা যায়।
"ম্যান হু সোল্ড দা ওয়ার্ল্ড'" গানটা শেষ বারের মতো শুনেছি প্রায় এক যুগ আগে। প্রচুর শুনতাম সে সময়। এক যুগ পর হটাৎ আজ সকালে এসে গানটা মাথায় টোকা দিয়ে বললো - "তোমার কি মনে পরে? একসময় বন্ধু ছিলাম আমি?" যাহোক তোমার কথা আমি দেয়ালে লিখে রাখলাম। এখন আমরা আবার যে যার জগতে ফিরে যেতে পারি।



Comments